Uddokta.com

উদ্যোগের আদ্যোপান্ত

ব্যবসা শুরুর পরে ৯৫% উদ্যোক্তারাই ঝরে পরে যায় কেন?

More Share, More Care!

“উদ্যোক্তা হও, দেশ গড়ো।” এই কথাটি আমাদের দেশের বিভিন্ন সভা সেমিনারে ব্যবহার করতে দেখা যায়। কিন্তু গবেষনায় দেখা গেছে, কোন ব্যবসা শুরুর ৫ বছরের মধ্যে ৯০% উদ্যোক্তারাই ঝরে পরে যায়। সব কিছুতেই কম বেশি লাভ এবং ক্ষতি রয়েছে কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার ব্যপারে অসফল হওয়ার সম্ভাবনা এতবেশি কেন? বর্তমানে দেশে যত উদ্যোক্তা রয়েছে তার বেশিরভাগই হলো তরুণ প্রজন্ম। তারা অনেকেই বিভিন্ন পাবলিক বা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কিংবা ন্যাশনাল কলেজে পড়ে। আমাদের দেশের স্বপ্নবাজ তরুণেরা এখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু দেশের অনেক তরুণেরা উদ্যোক্তা হতে চেয়েও অনেক বাধার কারণে পিছিয়ে পরছে, কেউ বা মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কারন উদ্যোক্তা হতে যে পরিমান আর্থিক এবং মানসিক সাহায্য প্রয়োজন তা আমরা দিতে অক্ষম, অনেক সময় সেগুলো থাকার পরেও অনেকের পরিশ্রমের ঘাটতি থাকার কারণে ঝরে পরতে হয়। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা কেন ঝরে পরছেন আজকের আর্টিকেলে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

দেশের ৯০% উদ্যোক্তাদের  ঝরে পরার কারণ 

উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন তীব্র মনোবল, পারিবারিক, সামাজিক এবং আর্থিক সাপোর্ট। মূলত এগুলোর অভাবেই বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা ঝরে পরে যায়। মূলত এই সাপোর্ট গুলো না পাওয়ার কারণেই অনেক স্বপ্নবাজ তরুনেরা ঝুঁকি নেয়ার সাহস পাননা। 

১. উদ্যোক্তা হতে পরিবারের বাধা: 

আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা মায়েরা সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সরকারী চাকুরীজীবী বানানোর স্বপ্ন দেখেন। আজ থেকে পঞ্চাশ কিংবা একশ বছর আগে বাবা মায়েরা সন্তানদের যা বানানোর স্বপ্ন দেখেন এখনকার বাবা মায়েদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই। যার ফলে কোনো সন্তান যখন সেসব ট্রেডিশনাল চিন্তাভাবনা থেকে বেড়িয়ে স্বাধীন কিছু করার স্বপ্ন দেখে ঠিক তখনই বিপত্তি বাধে। পড়াশোনা শেষ করে যখন কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, তখন পরিবার থেকে কটু কথা বা মন্তব্য আসে। বেশিরভাগ মানুষই বলে থাকেন পড়াশোনা করে যদি এসবই করতে হয়, তাহলে কষ্ট করে পড়াশোনা করলে কেন! মূলত এখান থেকেই একজন নবীন উদ্যোক্তার মনোবল হ্রাস পেতে শুরু করে। কারন গবেষনায় দেখা গেছে “ কোনো কাজের ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাবে সাপোর্ট পেলে সেই কাজে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।” 

২. উদ্যোক্তা হতে সামাজিক বাধা: 

আমাদের দেশে একটি প্রবাদ আছে, “পাছে লোকে কিছু বলে।”  অর্থাৎ ভালো কিংবা খারাপ যে কাজই হোক না কেন আশেপাশের মানুষেরা সবাই সেটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু করে দেন। উদ্যোক্তা হতে না পারার প্রধান আর একটি কারন হলো সামাজিক বাধা। বাংলাদেশের প্রতিটি সফল উদ্যোক্তা এবং ঝরে পরা উদ্যোক্তাদের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে সামাজিক বাধা। উদ্যোক্তা জীবনে পা রাখার পরে কোনো ভাবে যদি পারিবারিক বাধা কে পাশ কাটিয়ে একটু সামনে এগিয়ে যায়, তাহলে সমাজের মানুষ  আর একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যত ভালো কাজই বেছে নিননা কেন তারা এসে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করবে যার ফলে উদ্যোক্তারা হতাশায় ভোগেন, কখনো নিজেকে অনেক ছোট ভাবতে শুরু করেন। যার কারণে তরুণ সমাজ উদ্যোক্তা হতে আগ্রহ ও ইচ্ছা দুটোই হারায়। 

৩. উদ্যোক্তা হতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার অভাব: 

আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা যখন পারিবারিক এবং সামাজিক বাধা পেরিয়ে নিজেকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে তখন বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা আর্থিক সহযোগিতার অভাববোধ করেন। কারন দেশের বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী যারা উদ্যোক্তা হতে চান তারা বেশিরভাগই আসেন মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। আমাদের দেশ উদ্যোক্তাদের জন্য এখনো অনেক বন্ধুর। যদি কেউ তীব্র ইচ্ছাশক্তি নিয়ে আর্থিক ভাবে সাহায্যের জন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গুলোতে যায়, তখন তাদের হাজারো বিরম্বনা পোহাতে হয়, বিভিন্ন রকম প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। কোনো তরুণ উদ্যোক্তা যখন আর্থিক সাহায্যের জন্য সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে যায় তখন জটিল শর্ত থাকার কারণে বেশিরভাগ উদ্যোক্তারাই ফিরে যান। 

৪. উদ্যোক্তা হতে অনুকুল পরিবেশের অভাব: 

উদ্যোক্তা হতে প্রতি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বেশিরভাগ সময়ই কাঙ্খিত সাহায্য সহযোগীতা পাওয়া যায় না। নিজেকে সফল একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত করতে চাইলে  ঝুঁকি নেয়ার মত মানসিকতা তৈরি করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা এক বা দুইবার চেষ্টা করার পরে বিফল হলে আর উঠে দাড়াতে পারেন না। বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা উঠে না দাড়ানোর কারন হচ্ছে তাদের জন্য অনুকুল পরিবেশের অভাব। প্রতিকুল পরিবেশে উদ্যোক্তা জীবন শুরু করার কারণে এক সময় উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পরে এবং মাঝপথে থেমে যায়। তাদের মানসিক এবং আর্থিক সহযোগীতা করার মত পাশে কেউ থাকেনা। যার ফলে তারা নতুন করে ঝুঁকি নেয়ার সাহস পাননা। 

৫. কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে উদ্যোক্তা ঝরে পরে: 

আমাদের দেশের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সাবজেক্টের বাহিরে তেমন কোনো কার্যকরী ব্যবহারিক কোর্স করানো হয় না। যার দরুন শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। একজন ভালো উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজন বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী হওয়া, যেগুলো নিজে থেকে কখনো অর্জন করা যায় না। এরজন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষকের। বাহিরের দেশ গুলোতে উদ্যোক্তাদের জন্য কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় গুলোতে বিভিন্ন ধরনের সভা, সেমিনারের আয়োজন করা হয়, আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ধরনের গবেষনার, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত চাকরীমুখী হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার অভাব থেকে যায়। কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত না হওয়ার কারণে আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা ঝরে পরে যায়। 

৬. উদ্যোক্তা হতে সঠিক পরিকল্পনার অভাব: 

কোন কাজ শুরু করার আগে প্রধান শর্ত হলো লক্ষ্য নিশ্চিত করা। কারণ লক্ষ্য স্থির না করলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। যখন লক্ষ্য স্থির  করা থাকে তখন লক্ষ অনুযায়ী পরিকল্পনা করা যায়, যার ফলে কাজ করা সহজ হয় এবং সেই কাজে ঝুঁকি কম থাকে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ উদ্যোক্তাদের মধ্যে সঠিক পরিকল্পনার অভাব। পরিকল্পনা ছাড়া এগোলে যে কোনো কাজে পথভ্রষ্ট হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকে। একজন উদ্যোক্তা কে সঠিক পরিকল্পনা একটি রাস্তার ম্যাপের মত যেতে সাহায্য করে। তাই আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের ঝরে পরার আর একটি কারন হলো সঠিক পরিকল্পনার অভাব। 

৭. ব্যবস্থাপনার অভাবে উদ্যোক্তা ঝরে যায়: 

একজন সফল উদ্যোক্তা হতে হলে পরিপক্বতা অর্জন করা অনেক জরুরী। উদ্যোক্তা হতে হলে প্রচুর পরিমান অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা অর্থের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন না। একজন সফল উদ্যোক্তা হতে হলে সঠিক ভাবে সবকিছু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক উদ্যোক্তা তাদের লক্ষ্য পূরন করতে ব্যর্থ হয়। 

৮. উদ্যোক্তা হতে সম্যক ধারণার অভাব: 

একজন উদ্যোক্তাকে সবদিকে সমান ভাবে নজর রাখতে হয়। বর্তমান সময়ে সবকিছুতেই প্রতিযোগীতা রয়েছে। তীব্র প্রতিযোগীতার মাঝে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্যদের থেকে নিজেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখতে প্রয়োজন কৌশলী হওয়া। তাই বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা তীব্র প্রতিযোগীতার মধ্যে হিমশিম খেয়ে যায়। নিজের প্রতি আত্নবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যার কারণে উদ্যোক্তা হতে পারেনা। 

যেভাবে সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায়

উদ্যোক্তারা যদি নিজেকে আজীবন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চায় তাহলে তাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি কিছু দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।  যেমন:

  • সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য মনের মধ্যে তীব্র মনোবল পোষণ করতে হবে।
  • উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সঠিক পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। 
  • মার্কেটিং দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
  • অভিজ্ঞ সহকর্মীর সাহায্য নিতে হবে।
  • ধৈর্যচ্যুত হওয়া যাবেনা।

শেষ কথা | কেন ৯৫% উদ্যোক্তা ঝরে পরে যায়

উদ্যোক্তা হতে হলে ঝুঁকি নেয়ার মত মানসিকতা নিয়ে তারপর এই পথে যাওয়া উচিৎ। বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা কোনো রকম বাধাবিপত্তি ছাড়া সফল হতে চায়। কিন্তু উদ্যোক্তা হতে চাইলে কণ্টকাকীর্ণ পথে হাটার মানসিকতা তৈরি করে তবেই এই পথে যাওয়া উচিৎ। মনে রাখতে হবে পরিশ্রম ছাড়া কখনো সফল হওয়া যায় না। তাই উদ্যোক্তা হতে চাইলে পারিবারিক, সামাজিক এবং আর্থিক বাধা থাকলেও সেগুলো কৌশলে এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, তবেই সাফল্য হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। উদ্যোক্তা হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

ধারাবাহিক প্রশ্ন ও উত্তর ( FAQ) 

১। উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার কি করতে পারে? 

  • উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার বিনামূল্যে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে পারে।
  • স্কুল, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে কারিগরি প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা বাড়িয়ে দিতে পারে। 
  • উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারে। 

২। উদ্যোক্তাদের সফল হওয়ার জন্য সমাজ এবং পরিবারের কাজ কি? 

উদ্যোক্তাদের সফল হওয়ার জন্য পরিবার এবং সমাজের মানুষ তাদের মানসিক ভাবে সাপোর্ট করতে পারে। 

৩। উদ্যোক্তা হতে হলে প্রতিদিন কি করা উচিত? 

উদ্যোক্তারা নিয়মিত বিভিন্ন সভা বা সেমিনারে অংশগ্রহন করতে পারে, অনলাইনে উদ্যোক্তা বিষয়ক পডকাষ্ট দেখতে পারে।


More Share, More Care!

Leave a Reply Cancel reply