Uddokta.com

উদ্যোগের আদ্যোপান্ত

উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন অসুখী কেন?

More Share, More Care!

দাম্পত্য জীবনে অশান্তি আমাদের বর্তমান সমাজচিত্রের খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু অন্যান্য পেশাজীবীদের থেকে উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন তুলনামূলক বেশি অসুখী হয়ে থাকে। উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন অসুখী কেন এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া এতোটা সহজ নয়। দাম্পত্য জীবন অসুখী হবার অনেক কারণই রয়েছে। এক্ষেত্রে পার্টনারকে ঠিকমতো সময় না দেয়া অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া দাম্পত্য সম্পর্কের কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে যেগুলো উদ্যোক্তা জীবনে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পরে যার কারণেও সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে।

উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন অসুখী হবার কারণসমূহ:

বেশিরভাগ উদ্যোক্তারাই ব্যক্তিজীবনে খুব একটা সুখী হতে পারে না। যেহেতু উদ্যোক্তাদের কোনো বস নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের বস হয়ে থাকেন, তাই ব্যবসায়িক কাজের সবকিছু তাদেরকে একা হাতে সামাল দিতে হয়। যার কারণে অতিরিক্ত ব্যস্ততায় তাদের দাম্পত্য জীবনে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়। চলুন এবার উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন অসুখী কেন তার প্রধান কারণগুলো দেখে নেয়া যাক।

১। সময় কম দেয়া:

উদ্যোক্তারা সাধারণত দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যবসায়িক কাজ নিয়েই থাকেন। এমনকি অন্যান্য পেশা বা চাকুরিজীবীদের তুলনায় উদ্যোক্তাদের কাজের ক্ষেত্রে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। তাই তারা পরিবার বা নিজের স্ত্রীকে খুব একটা কোয়ালিটি টাইম দিতে পারেন না। যার ফলস্বরূপ সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

২। ঠিকমত কমিউনিকেট না করা:

স্ত্রীকে ঠিকমতো সময় দিতে না পারায় এক সময় দেখা যায় দুজনের মাঝে কমিউনিকেশনও কমে আসে। এতে করে দুজনের বোঝাপড়ার দিকটাও বেশ সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। এভাবে একসময় ভুল বোঝাবোঝির মতো সমস্যার জন্ম দেয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্বামীর সাথে কম কমিউনিকেশন থাকায় স্ত্রীরা তাদের সন্দেহ করে বসেন যা সম্পর্কে ভাঙ্গনের সুর বেজে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩। পরিবার থেকে দূরে থাকা:

পরিবারে সন্তানদের দেখাশোনায় বাবা মা উভয়েরই সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠায় মায়ের পাশাপাশি বাবারও সজাগ তদারকির প্রয়োজন। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা বাবা বেশিরভাগ সময় কাজে ব্যস্ত থাকায় সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে ব্যর্থ হন। ফলস্রূতিতে এসবকিছু বউকে একা হাতে সামাল দিতে হয়। 

এক্ষেত্রে দেখা যায় বউরা একা হাতে সবকিছু করতে গিয়ে হিমশিম খায় এবং পরিবারে নানা ধরনের সমস্যা লেগেই থাকে। এসব কিছুর কারণে স্ত্রীরা তাদের উদ্যোক্তা স্বামীর প্রতি কিছুটা বিরক্ত থাকেন যার প্রভাব দাম্পত্য জীবনে বেশ ভালোভাবেই পরে। তাছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ভালো সম্পর্ক থাকে না। যার প্রভাব দাম্পত্য জীবনে পরোক্ষভাবে পরতে পারে।

৪। ব্যবসায়িক কাজে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া:

উদ্যোক্তাদের ব্যবসা যত বেশি প্রসার লাভ করে, কাজের চাপও তত বেশি বেড়ে যেতে থাকে। এক্ষেত্রে একটা সময়ে দেখা যায় তারা ব্যবসার কাজ বাদে অন্য কোনো দিকে একদমই সময় দিতে পারেন না। এমনকি অনেক সময় দেখা যায় উদ্যোক্তারা অফিসে কাজ শেষ করতে না পারায় বাসায় এসেও কাজ করতে থাকেন। 

এতে করে বাসায় পরিবার বা স্ত্রীকে সময়তো দেনই না বরং নিজের ব্যক্তিগত কাজগুলোও সময়মতো করতে পারেন না। এই বিষয়গুলোই একসময় প্রকট আকার ধারণ করে দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি করে। 

৫। পার্টনারের প্রতি মনোযোগ কম দেয়া: 

সাধারণত প্রকৃত উদ্যোক্তারা সারাক্ষণই তাদের ব্যবসায় কীভাবে প্রসার করা যায় তা নিয়েই মেতে থাকে। একমাত্র ব্যবসায়িক জীবনে চরম সাফল্যই তাদেরকে সুখ-শান্তি দিয়ে থাকে। এ কারণে উদ্যোক্তারা ব্যবসা বা তাদের কাজকেই একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে ফেলেন। তখন আর পার্টনারকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন না। 

পার্টনারের ব্যাসিক চাহিদাগুলো পূরণ করেই আবার নিজের কাজে মন দেন। সঙ্গিনীর ছোট ছোট বিষয়গুলোর প্রতি আর গুরুত্ব দেন না। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় অভিমান, অভিমান থেকে অভিযোগ এবং সবশেষে একসময় দূরত্ব তৈরি হয়ে সম্পর্কে ফাটল ধরে।

৬। স্পেশাল ডে গুলো গুরুত্ব না দেয়া:

যেকোনো সম্পর্কেই কিছু স্পেশাল ডে বা ওকেইশন থাকে যেমন: ম্যারেজ ডে, পার্টনারের বার্থ ডে ইত্যাদি। একটা সম্পর্ক সুন্দর করতে এই বিষয়গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু একজন উদ্যোক্তাকে প্রতিনিয়ত একটা টাফ টাইম ম্যানেজমেন্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। 

বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় প্রতিদিনই তাদেরকে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং বা কমিউনিকেট করতে হয়। তাই তাদের এই ব্যস্ত ক্যালেন্ডারে পার্টনারের স্পেশাল ডে গুলোর জন্য আলাদা করে আর কোনো সময়ই থাকে না।

৭। অনিশ্চিত ভবিষ্যত:

উদ্যোক্তা হল এমন এক পেশার নাম যেখানে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ঘিরে থাকে। ব্যবসায়িক জীবনের উত্থান-পতনের কারণে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সচ্ছলতা কখনই স্থায়ী হয় না। এতে করে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে নানা বিপাকে পড়তে হয়। 

ক্ষেত্র বিশেষে নানা ধরনের অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েও যেতে হয়। এরকম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক প্রভাব পরে। এমনকি এই আর্থিক অনটনের কারণে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটে থাকে।

৮। জেদী বা একগুয়ে মনোভাব:

সাধারণত বেশিরভাগ উদ্যোক্তারা খানিকটা জেদী বা একগুঁয়ে স্বভাবের হয়ে থাকে। তারা সবসময়ই নিজেদের কথা বা মতামতকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিবারের সদস্যদের প্রতিও এক ধরনের কর্তৃত্ব পেতে চায় যার দরূণ স্ত্রী-পরিজনরা তাদের ওপর ত্যাক্ত হয়ে উঠতে পারে। 

তাই জেদী মনোভাব উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। কেননা এই ধরনের কার্যকলাপ তাদেরকে পার্টনার বা পরিবার থেকে অনেকখানি দূরে সরিয়ে দেয়।

৯। বেশিরভাগ সময় স্ট্রেসড থাকা:

ব্যবসায়িক কাজের চাপে উদ্যোক্তারা সারাক্ষণই একটা ব্যস্ত জীবন পার করেন। অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে উদ্যোক্তাদের মানসিক অবস্থা বেশিরভাগ সময়ই স্বাভাবিক থাকে না। ব্যবসার নানা উত্থান-পতনকে সামাল দিতে দিতে তারা সর্বক্ষণই একটা মানসিক চাপের মাঝে কাটান। 

অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে তারা অনেক সময়ই পার্টনারের সাথে রাগারাগি করে ফেলেন যা দাম্পত্যে বড় আকারের ঝগড়ার সূত্রপাত করতে পারে। এছাড়া এই ধরনের মানসিক চাপের কারণে একজন আরেকজনকে বোঝার চেষ্টাটুকুও কমে আসে।

অতিরিক্ত কাজ ও মানসিক চাপের কারণে উদ্যোক্তারা দাম্পত্য জীবনের প্রতি কম মনোযোগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু পার্টনার যদি সাপোর্টিভ এবং ধৈর্যশীল হন তবে দাম্পত্য জীবনের এই সমস্যাগুলো খুব সহজেই সমাধান করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে দুজনকে সকল বিষয়ে বোঝাপড়া করে নিতে হবে এবং একজন আরেকজনের প্রতি সমানভাবে সহমর্মি মনোভাব রাখতে হবে। উদ্যোক্তাদের দাম্পত্য জীবন অসুখী কেন তার কারণগুলো তো জেনে নিলেন। এবার নিজেদের সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করার প্রয়াসে লেগে পরুন।

FAQ:

১। উদ্যোক্তা হিসেবে দাম্পত্য জীবন সুখী করার সঠিক উপায় কী হতে পারে? 

উদ্যোক্তা হিসেবে দাম্পত্য জীবনকে সুখী করতে চাইলে পার্টনারকে সময় দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কাজ এবং সংসারের জন্য আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখতে হবে। এছাড়া দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে অনেক বিষয়ই সহজ করে নেয়া সম্ভব। 

২। দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করতে উদ্যোক্তাদের পার্টনারের সাপোর্ট কতটুকু প্রয়োজন? 

একজন উদ্যোক্তা কখনই তার পার্টনারের সাপোর্ট ছাড়া পেশা এবং ব্যক্তিজীবনে সফল হতে পারে না। পার্টনারের পরিপূর্ণ সাহায্যেই ব্যক্তি এবং পেশাজীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই সহজেই পাড় করা যায়। একারণে উদ্যোক্তাদের পার্টনারকে অবশ্যই অবশ্যই সাপোর্টিভ মনোভাবের হতে হয়। 

৩। বিয়ের আগে একজন উদ্যোক্তার পার্টনার নির্বাচনে কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে? 

যথেষ্ট সাপোর্টিভ এবং সহনশীল ধাঁচের মানুষরাই উদ্যোক্তাদের ভালোমতো বুঝতে পারে। এই ধরনের মানুষরা অভিযোগ কম রাখে এবং সংসার ও অন্যান্য কাজে পার্টনারকে অনেক সহায়তা করে। যার ফলে সংসার জীবন সহজ ও সুখী হয়। 

৪। পরিবার এবং ব্যবসা এই দুই বিষয়ে কীভাবে সময় সমন্বয় করা যায়? 

উদ্যোক্তাদের জীবনে পরিবার এবং ব্যবসায়িক কাজের মাঝে সমন্বয় করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কাজের পাশাপাশি সংসার ও পরিবারের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করে নেয়াটা জরুরি। এবং সেই সাথে পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত সময়ে ব্যবসায়িক সকল কাজ থেকে দূরে থাকটা বাঞ্ছনীয়।


More Share, More Care!

Leave a Reply Cancel reply