Uddokta.com

উদ্যোগের আদ্যোপান্ত

ব্যবসা শুরুর পরে কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হয়?

More Share, More Care!

যেকোন ব্যবসা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে যায়। এক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে করে চূড়ান্ত ফলাফলে পৌঁছতে হয়। প্রায় সকল উদ্যোক্তারাই ব্যবসা শুরুর আগের পরিকল্পনা ভালোভাবে করলেও ব্যবসা শুরুর পরের পরিকল্পনা ঠিকভাবে করতে পারেন না। যার ফলে ব্যবসার চূড়ান্ত ফলাফল আশানুরূপ হয় না।  ব্যবসা শুরুর পরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বিনিয়োগ করা অত্যাবশ্যক। এটা ব্যবসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ। চলুন এবার  ব্যবসা শুরুর পরে কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হয়? সেই বিষয়গুলো নিয়ে এখন বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

ব্যবসায় বিনিয়োগ করা আসলে কী?

ব্যবসার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম। বলা হয়ে থাকে যেকোন ধরনের ব্যবসার মূলে হল বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বলতে বোঝায় কোনো সঞ্চিত অর্থকে কোনো জায়গায় খরচ করে সেটাকে লাভের মাধ্যমে নতুন মূলধনে রূপান্তর করা। অর্থাৎ কোনো একটা নির্দিষ্ট খাত বা পণ্যের উন্নয়ন, বিপণন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে সেখান থেকে যে লাভের অংশ পাওয়া যায় সেটা নতুন মূলধন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই মূলত বিনিয়োগ করা বলা হয়। বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হল লাভ করা। 

ব্যবসা করার ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যবসা শুরুর আগে ও পরে দুই সময়েই সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। অনেক ব্যবসায়ী বিশেষত যারা নতুন ব্যবসায় নামেন তাদের বেশিরভাগই মনে করেন শুধু ব্যবসা শুরুর আগে বিনিয়োগ করলেই হয়, এরপর আর তেমন কিছুর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এটা পুরোপুরি ভুল ধারণা। 

নতুন ব্যবসা শুরুর পরে সেটাকে ধীরে ধীরে প্রসারের জন্য সংশ্লিষ্ট অনেক খাতে বিনিয়োগ করতে হয়। এই খাতগুলো সাধারণত একটা ব্যবসার অভ্যন্তরীণ খাত। এগুলোতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ ব্যতীত কখনই ব্যবসায় লাভ করা সম্ভব নয়। 

ব্যবসার বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন কেন? 

ব্যবসা শুরুর আগে যেমন বিনিয়োগ লাগে, ঠিক তেমনি ব্যবসা শুরুর পরেও অনেক বিষয়ের উপর বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। যেকোন ব্যবসা একটা গতিশীল প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে ব্যবসা যতই এগিয়ে যেতে থাকে ততই বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ খাতে বিনিয়োগের চাহিদাও বাড়তে থাকে। 

ব্যবসা শুরুর পরে সেটা সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে অনেক বিষয়ের পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করতে হয়। অনেকে এই ধাপটি এড়িয়ে যায়। যার ফলস্বরূপ ব্যবসায় তেমন লাভ হয় না অথবা বেশিদিন টেকানো যায় না। অভ্যন্তরীণ এই খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পণ্যের মান উন্নয়ন, দক্ষ কর্মী নিয়োগ এবং পণ্যের প্রচার ইত্যাদি। এই খাতগুলোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করলে ব্যবসায় দ্রুতই সাফল্য পাওয়া সম্ভব হয়। 

ব্যবসার অভ্যন্তরীণ এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ করলে ব্যবসার প্রসার হয়, বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে নিজের পণ্য নিয়ে পৌঁছানো যায়। এজন্য ব্যবসা শুরুর পরে অবশ্যই সুষ্ঠু বিনিয়োগ করতে হবে। 

উদ্যোক্তা হিসেবে কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা উচিৎ?

একজন নতুন উদ্যোক্তা তার ব্যবসার মাধ্যমে তার উদ্যোগ বা পণ্যকে সকলের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের সঠিক বন্টন। ব্যবসা শুরুর আগে দেখা যায় নতুন উদ্যোক্তারা পণ্য এবং ব্যবসার অন্যান্য বিষয়ে প্রচুর বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু ব্যবসা শুরুর পরে এ নিয়ে আর তেমন মাথা ঘামায় না। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যবসার ভাঙ্গন। বিশেষত ডিজিটাল ব্যবসায় সুষ্ঠু বিনিয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৭টি খাতে খরচ করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। চলুন এখন জেনে নেয়া যাক একজন নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসার কোন ৭টি খাতে বিনিয়োগ করতে হয়। 

১। দক্ষ কর্মী নিয়োগ:

যেকোন ব্যবসাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে কর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। এজন্য নিজের ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে অবশ্যই দক্ষ কর্মী বাছাই করে নিয়োগ দিতে হবে। নতুন নতুন বিভিন্ন আইডিয়া জেনারেট, কৌশল অবলম্বন, পণ্যের মূল্যমান বৃদ্ধি ইত্যাদি কেবল দক্ষ কর্মীদের দ্বারাই সম্ভব। আপনার ব্যবসায় কর্মীরা যত বেশি দক্ষ হবে ব্যবসার উন্নয়ন তত বেশি হবে। এজন্য বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে এই খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। 

২। ব্যবসার প্রচার ও প্রসার:

ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবার প্রচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এককথায় বলা যায় যেকোন ব্যবসায় সফল হবার মূল চাবিকাঠিই হল সঠিক কৌশল অবলম্বন করে ব্যবসা এবং পণ্যের প্রচার করা। এর জন্য প্রয়োজন এই খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। বর্তমানে ডিজিটাল ব্যবসার যুগ হওয়ায় সবকিছু অনলাইনেই করা যায়। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় নিজের পণ্যকে কার্যকরী উপায়ে তুলে ধরা, ওয়েবসাইট বানানো ইত্যাদি কাজে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য। 

এমনকি ব্যবসা যদি অফলাইন হয়ে থাকে সেটাকে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন করতে হবে। এক্ষেত্রেও আলাদা করে বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। আবার ব্যবসার প্রসারের জন্যও অনেক ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় যেমন: ক্রেতার কাছে ঠিকভাবে পণ্য পৌঁছনো, বিক্রিত পণ্যে কোনো সমস্যা হলে সেটার সমাধান ইত্যাদি। এই বিষয়গুলোতেও আলাদাভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। 

৩। পণ্যের মান উন্নয়ন:

পণ্য হল একটি ব্যবসার জীবন। ব্যবসার শুরুতে পণ্য একরকম থাকলেও ক্রমশ ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের গুণগতমানে পরিবর্তন আনতে হয়। একজন ক্রেতা তখনই আপনার কাছ থেকে পণ্য কিনবে যখন ক্রেতার সকল চাহিদা ওই এক পণ্যেই পূরণ হবে। এজন্য ব্যবসার পরিধি বাড়ার সাথে সাথে পণ্যের মান উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া পণ্যের মান উন্নয়নের পাশাপাশি পণ্যের প্যাকেজিংয়ের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই ব্যবসাকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে এই সকল বিষয়ে বিনিয়োগের জন্য অবশ্যই আলাদা বাজেট রাখতে হবে।  

৪। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগ:

বর্তমান যুগ হল তথ্য প্রযুক্তির যুগ। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি এসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগুলো মানবজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি ব্যবসা ক্ষেত্রেও রাখতে পারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ব্যবসার অনেক কাজকে সহজলভ্য করে দেয় এই প্রযুক্তিগুলো। তাই নতুন এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করার কাজে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। 

৫। ব্যবসার বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নে:

ব্যবসাকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন সময়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এই কৌশলগুলো বাস্তবায়নে দরকার সঠিক বিনিয়োগ। ব্যবসা শুরুর পরে ব্যবসাকে পরিচালনা করতে, ব্যবসার প্রসার, প্রচারে বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আগাতে হয়। যেমন: বিভিন্ন কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ, বিভিন্ন ইভেন্ট স্পন্সর করা ইত্যাদি কাজে খরচ করতে হবে।

৬। ব্র্যান্ডিং বা পণ্যের নিজস্বতা রক্ষায়:

ব্র্যান্ডিং যেকোন ব্যবসার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ। ব্যবসা যখন মোটামুটি দাঁড়িয়ে যায় এবং পরিচিতি লাভ করে তখন ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে মনোযোগী হতে হবে। ব্র্যান্ডিং বা পণ্যের নিজস্বতা রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন: বিজনেস কার্ড, লোগো, প্যাকেজিং ইত্যাদির জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। 

৭। ব্যবসার মডেলের উন্নয়ন:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো একটা নির্দিষ্ট বিজনেস মডেলকে অনুসরণ করে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ব্যবসা যখন বড় হয় তখন ওই বিজনেস মডেলে কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে দেখা যায় বিজনেস মডেলের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তন আনতে কিছু বিনিয়োগের প্রয়োজন পরে। বিশেষত বড় কোম্পানিগুলোতে এই খাতে খরচের জন্য অবশ্যই বাজেট রাখতে হয়। 

 

ব্যবসায় বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা কীভাবে করতে হয়?

নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরুর পরে সঠিকভাবে  বিনিয়োগের পরিকল্পনা করতে হিমশিম খায়। এজন্য ব্যবসার বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা ব্যবসা শুরুর আগেই করে রাখা ভালো। সাধারণত যেকোন ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হয়। 

১। পুরো ব্যবসার পরিকল্পনা সাজানো:

ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমেই পুরো ব্যবসার পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ব্যবসার বিষয়, পণ্যের প্রচার, মানউন্নয়ন ইত্যাদি সকল বিষয়ের পরিকল্পনা করে একটা খসড়া নির্দিষ্ট করতে হবে। 

২। বিনিয়োগের খাতগুলো নির্দিষ্ট করা:

প্রতিটি ব্যবসায় বিনিয়োগের খাত ব্যবসা বা পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট খাত রয়েছে যেগুলো প্রতিটি ব্যবসার ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের উপযোগী। ব্যবসার বিনিয়োগ উপযোগী খাতগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী সাজাতে হবে। 

৩। সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কৌশল অবলম্বন করা:

ব্যবসায় সুষ্ঠু বিনিয়োগ অনেক বেশী প্রয়োজন। এজন্য ব্যবসার লভ্যাংশ বা নিজের মূলধনকে সকল খাতে সঠিকভাবে বণ্টন করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। যেমন: নিজের কাস্টমারকে জানা, ভবিষ্যতের প্রতি যথাযথ মনোযোগী হওয়া ইত্যাদি। এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে বাস্তবায়ন করতে পারলে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও সুষ্ঠুভাবে সকল খাতে বাস্তবায়িত হবে। 

শেষ কথা:

ব্যবসা শুরুর পরে কোন কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হয় এই বিষয় নিয়ে বেশিরভাগ উদ্যোক্তারাই মাথা ঘামান না। বিশেষ করে যারা নতুন উদ্যোক্তা হয়েছেন তাদেরকে ব্যবসা শুরু করার আগেই বিভিন্ন খাতে পরিমিত বিনিয়োগের জন্য একটা পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করে রাখা উচিত। ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সুষ্ঠু বিনিয়োগই ব্যবসায় সাফল্য আনতে বদ্ধপরিকর। 

FAQ:

১। ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন কোন খাত বেশি গুরুত্বপূর্ণ? 

দক্ষ জনকর্মী, পণ্যের মান উন্নয়ন, পণ্যের প্রচার এবং ব্র্যান্ডিং এই খাতগুলো একটি ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই চারটি খাতের কোনোটা সঠিক বিনিয়োগের অভাব হলেই ব্যবসার প্রসার বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য অন্যান্য খাতের তুলনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই চারটি খাতেই সবচেয়ে বেশি খরচ করতে হবে।


More Share, More Care!

Leave a Reply Cancel reply