Uddokta.com

উদ্যোগের আদ্যোপান্ত

আমাজন এফবিএর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অনলাইন ব্যবসা করার উপায়

More Share, More Care!

আমাজনের বিজনেস মডেলগুলোর একটি হল এফবিএ মডেল। বর্তমানে আমাজনে বিজনেস করার ক্ষেত্রে এই এফবিএ মডেলই সবথেকে জনপ্রিয়। এখন প্রশ্ন হল আসলে এই আমাজন এফবিএ কী? 

আমাজন এফবিএ হল একটি থার্ড পার্টি হোলসেল সেলিং বিজনেস যেটা আমাজন কর্তৃক অনুমোদিত দেশগুলোর নাগরিকরাই শুধু করতে পারবে। এই বিজনেস মডেলটি হল পুরোপুরি অনলাইন ভিত্তিক। যার কারণে ঘরে বসে সহজেই এই বিজনেস করে আয় শুরু করা যায়। কম পুঁজির ব্যবসা হওয়াতে যে কেউ এই বিজনেস শুরু করতে পারে।

আমাজন এফবিএ কি?

আমরা সকলেই জানি বর্তমান বিশ্বের ই-কমার্স সেক্টরে আমাজন ৪র্থ বৃহত্তম সাইট। আমাজন শুধু একটা নয় বরং বেশ কয়েকটি বিজনেস মডেলের সংঘবদ্ধ প্রয়োগে আজকের অবস্থানে এসেছে। প্রয়োগকৃত এই মডেলগুলোর মধ্যে আমাজন FBA হল আমাজনের অন্যতম একটি বিজনেস মডেল। আমাজন FBA-র পূর্ণ নাম হল “Fulfillment by Amazon”. একে হোলসেল মডেলও বলা হয়। বর্তমানে আমাজনের ৫০% এর উপরে আয় হয় এই আমাজন FBA থেকেই।

আমাজনের সাথে অনেক থার্ড পার্টি সেলার যুক্ত আছে যারা বিভিন্ন সোর্স থেকে পণ্য সংগ্রহ করে আমাজনের ওয়্যারহাউজগুলোতে পণ্য সরবরাহ করে। এই থার্ড পার্টি সেলাররা পণ্য পাঠানোর পরে পণ্যটি ওয়েবসাইটে প্রদর্শন থেকে শুরু করে বিক্রি এবং পরবর্তী সকল কাজ আমাজন কর্তৃপক্ষই করে থাকে। এতে করে আমাজন নিজে কিছু লভ্যাংশ রাখে এবং বাকিটা সেলারকে হস্তান্তর করে। এই পদ্ধতিকেই মূলত আমাজন FBA বলা হয়। 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আমাজনের এই হোলসেল বিজনেস করে লক্ষ লক্ষ মানুষ আয় করছে। এক্ষেত্রে এসব দেশের এই সেলারদেরকে থার্ড পার্টি সেলার বলা হয়। সাধারণত আমাজন FBA-তে থার্ড পার্টি সেলাররাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কেননা আমাজনের বেশিরভাগ পণ্যই থার্ড পার্টি সেলারই সরবরাহ করে। এজন্য আমাজনের এই বিজনেস মডেল বর্তমান বিশ্বে অনেক কার্যকরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কীভাবে আমাজন এফবিএ কাজ করে?

আমাজন এফবিএ বেশ জনপ্রিয় হলেও এই মডেলে বিজনেস করার অনেকগুলো নিয়ম-কানুন রয়েছে। এগুলো অনুসরণ করেই আমাজন এফবিএ-র এই পুরো প্রক্রিয়াটা কাজ করে। এক্ষেত্রে কিছু ইনভেস্টমেন্ট এবং ডকুমেন্ট বানানোর প্রয়োজন পরে। 

প্রথমেই আমাজনে যারা থার্ড পার্টি হোলসেলার হিসেবে কাজ করতে চায় তাদেরকে বিজনেস রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এটাও আবার অনেকগুলো ডকুমেন্ট করার একটি সম্মিলিত কাজ। যে সকল দেশ আমাজন কর্তৃপক্ষ দ্বারা ভেরিফাইড, একমাত্র সেই দেশের নাগরিকরাই আমাজনে হোলসেল করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকরা আমাজন হোলসেল করতে পারবে। বিজনেস রেজিস্ট্রেশনের পর নামকরা ব্যান্ডদের থেকে হোলসেল মূল্যে তাদের পণ্যগুলো কিনে নিতে হয়। 

তবে অবশ্যই এমন পণ্য নির্বাচন করতে হবে যেগুলোর কাস্টমারদের কাছে খুব ভালো চাহিদা আছে। পণ্য হোলসেলে কেনার পর সেগুলো আমাজনের ওয়্যারহাউজে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর পণ্যগুলো প্রফিটসহ বিক্রি করার জন্য মূল্য ঠিক করে দিতে হবে। আমাজন কর্তৃপক্ষ সেই নির্ধারিত মূল্যসহ পণ্যগুলোর ছবি তাদের ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবে এবং কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে সরবরাহও করবে। বিক্রীত পণ্যের লভ্যাংশের মধ্য থেকে আমাজন নিজেদের কমিশন রেখে বাকি অর্থ সেলারের একাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই মূলত আমাজন এফবিএ কাজ করে। 

কীভাবে আমাজন এফবিএ- এর মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করবেন?

আমাজন এফবিএ-র মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করা খুব একটা কঠিন কিছু না। স্বল্প পুঁজি এবং স্বল্প সময়ে যে কেউ এই ব্যবসায় ভালো করতে পারে। শুধু প্রয়োজন একটু মার্কেট রিসার্চ এবং সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামা। আমাজন এফবিএ যেহেতু পুরোটাই অনলাইন বিজনেস, তাই প্রথমে অবশ্যই আপনার একটি নিজস্ব কম্পিউটার এবং ভালো ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এবার চলুন ব্যবসা শুরুর আগে পরবর্তী ধাপগুলো জেনে নেয়া যাক। 

১। আমাজন সেলার একাউন্ট:

এফবিএ মডেলের বিজনেসে আমাজন সেলার একাউন্টটাই প্রধান। কেননা এই একাউন্ট দিয়েই আপনার ব্যবসা পরিচালিত হবে। একটা সেলার একাউন্ট খুলতে সাধারণত ভ্যালিড পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট লাগে। একাউন্ট খোলার সকল কাজ অনলাইনেই করা যাবে। 

২। LLC রেজিস্ট্রেশন:

LLC রেজিস্ট্রেশন বলতে বিজনেস রেজিস্ট্রেশন বা ভেরিফিকেশনকে বোঝায়। এর জন্য আপনাকে আমেরিকার যে কোনো একটি স্টেট থেকে বিজনেস লাইসেন্স বা LLC করাতে হবে। LLC রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা ডিস্ট্রিবিউটর আমাজন সেলারদের সাথে সাধারণত কাজ করতে চায় না। 

৩। রিসেল সার্টিফিকেট:

রিসেল সার্টিফিকেট থাকলে কোনো ব্র্যান্ড বা ডিস্ট্রিবিউটর থেকে সহজেই ট্যাক্স ছাড়া পণ্য অর্ডার করা যায়। এজন্য রিসেল সার্টিফিকেট করা অনেক প্রয়োজনীয়। অনলাইনে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফ্রিতে এই সার্টিফিকেট করে ফেলা যায়। 

৪। প্রফেশনাল ব্যাংক একাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ড:

টাকা আদান-প্রদানের জন্য একটা প্রফেশনাল বিজনেস ব্যাংক একাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে। ডিস্ট্রিবিউটররা সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য উপায়ে লেনদেন করেন না। 

৫। EIN Number:

EIN এর পূর্বরূপ হল Employer Identity Number. এটাকে ফেডারেল ট্যাক্স আইডিও বলা হয়। এই নম্বরটি হল আপনার বিজনেসের সোস্যাল আইডেন্টিটি। ডিস্ট্রিবিউটর হোলসেল অ্যাপ্লিকেশন ফরমে এই নম্বরটা দিতে হয়। ওয়েবসাইটে সহজেই EIN রেজিস্ট্রেশন করা যায়। 

৬। প্রফেশনাল ইমেইল, অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বর:

আমাজন এফবিএ-তে ডিস্ট্রিবিউটর থেকে আমাজন কর্তৃপক্ষসহ সকল যোগাযোগ ইমেইল এবং ফোনের মাধ্যমে করতে হয়। এজন্য অবশ্যই একটা প্রফেশনাল ইমেইল এবং ফোন নম্বর থাকতে হবে। আবার কোনো কোনো ব্র্যান্ড বিজনেস অ্যাড্রেস আর ওয়েবসাইট ছাড়া কাজ করতে চায় না। তাই ব্যবসা শুরুর আগে এগুলোও করে রাখতে হবে। 

৭। ইনভেস্টমেন্ট:

আমাজন এফবিএ থেকে কম সময়ে দ্রুত আয় করতে চাইলে কিছু পরিমাণ ইনভেস্টমেন্টের প্রয়োজন পরে। তবে কিছু উপায় রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে কোনো প্রকার ইনভেস্টমেন্ট ছাড়াও আমাজন এফবিএ বিজনেস করা যায়। বিজনেস রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ডকুমেন্ট রেডি এবং প্রোডাক্ট অর্ডার পর্যন্ত সবকিছু মিলিয়ে সর্বনিম্ন প্রায় $৫০০০ ডলার ইনভেস্ট করতে হয়। প্রোডাক্ট অর্ডারের ক্ষেত্রে মিনিমাম $২৫০-$৫০০ ডলারের প্রোডাক্ট অর্ডার করতে হয়। আর বাকি পুরো টাকাটা বিজনেস রেজিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট রেডি করার কাজে লাগে। 

৮। প্রোডাক্ট:

এফবিএ বিজনেসে প্রোডাক্ট সিলেকশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এক্ষেত্রে সবসময় এমন প্রোডাক্ট সিলেক্ট করতে হবে যেগুলোর বাজারে খুব ভালো কাস্টমার চাহিদা রয়েছে। শুরুর দিকে হালকা, ওজন কম এবং সেলিং প্রাইস রেঞ্জ $৫০-$১১০ ডলার এরকম কম মূল্যের প্রোডাক্ট দিয়ে শুরু করা ভালো। 

৯। ইংরেজি ভাষা দক্ষতা:

আমাজন এফবিএ বিজনেসে আপনার অবশ্যই অবশ্যই ইংরেজিতে বেসিক যোগাযোগ দক্ষতা থাকতে হবে। কেননা ব্যবসার সকল কথা-বার্তা ইমেইল, ফোন অথবা ম্যাসেজে ইংরেজিতেই করতে হয়। 

আমাজন এফবিএ-তে প্রফিট কেমন হয়?

আমাজন এফবিএ একটি স্বল্প পুঁজির ব্যবসা। এই ব্যবসায় স্বল্প সময়ের মধ্যেই আয় করা শুরু করা যায়। এমনকি মূলধনও খুব তাড়াতাড়ি তুলে ফেলা যায়। এছাড়া স্বল্প পুঁজিতে শুরু করা যায় বলে বড় লস হবার রিস্কও কম থাকে। আবার মিনিমাম ইনভেস্টমেন্টের পর আপনি চাইলে ধীরে ধীরে ব্যবসা বড়ও করতে পারবেন। 

সাধারণত বিগিনার হিসেবে একজন আমাজন এফবিএ সেলার মাসে $৩০০-$৫০০ ডলার ইনকাম করতে পারে। তবে এই এমাউন্ট বিজনেস বড় হবার সাথে সাথে বাড়তে থাকে। ব্যবসা মোটামুটি দাঁড়ালে $১০০০ পর্যন্তও অনায়াসেই ইনকাম করা যায়। 

আমাজন এফবিএ-র সুবিধা-অসুবিধা কী কী? 

যেকোন বিজনেস মডেলের সুবিধা-অসুবিধা দুইই রয়েছে। এজন্য সকল বিষয় পর্যালোচনা করে কোন মডেলটি আপনার জন্য বেশি লাভজনক হবে তা আপনাকেই বেছে নিতে হবে। এখন আমাজন এফবিএ-র সুবিধা-অসুবিধাগুলো জেনে নেয়া যাক। 

সুবিধা: 

১। আমাজনের অন্যান্য বিজনেস মডেলের তুলনায় এফবিএ মডেলে দ্রুত ব্যবসা স্যাটেল করা যায়। অনেক কম সময়েই আয় শুরু এবং বিজনেস বড় করা যায়। 

২। যেহেতু এফবিএ বিজনেসে নামিদামি ব্র্যান্ড বা ডিস্ট্রিবিউটরের থেকে প্রোডাক্ট কেনার সুযোগ থাকে তাই সেগুলো আমাজনে বিক্রি করার জন্য আলাদা করে আর কোনো মার্কেটিং লাগে না। কেননা মার্কেটে আগে থেকেই এই ব্র্যান্ডগুলোর প্রোডাক্টের ভালো চাহিদা থাকে। 

৩। আমাজনে এফবিএ-সহ অন্যান্য যেকোন বিজনেস মডেলের একটা ভালো দিক হলো প্রোডাক্টের ভালো চাহিদা থাকে। যার কারণে কম সময়ে প্রোডাক্ট বিক্রি করে ইনকাম করা যায়। 

৪। সাধারণত ব্র্যান্ড বা ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোডাক্ট মজুদ থাকে। একারণে সর্বদাই প্রোডাক্টের সহজলভ্যতা দেখা যায়।

অসুবিধা:

১। অনেক সময় অনেক ব্র্যান্ডই আমাজনের হোলসেল সেলারদের সাথে কাজ করতে চায় না। এই লিস্টে অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড রয়েছে যাদের এই বিজনেস মডেলে আপত্তি রয়েছে। 

২। আমাজন এফবিএ-তে বিজনেস লাইসেন্স একটি অতি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট। প্রায় সকল ব্র্যান্ডই লাইসেন্স ছাড়া কাজ করতে রাজি হয় না। এছাড়া বিজনেস লাইসেন্সিং কিছুটা ঝামেলারও বটে। 

৩। বর্তমানে অনেক বেশি জনপ্রিয় হবার কারণে অনেক মানুষই আমাজন এফবিএ বিজনেসের দিকে ঝুঁকছেন। দেখা যায় একই প্রোডাক্ট অনেকজন অনেকভাবে বিক্রি করছে। এজন্য বর্তমানে এই বিজনেস অনেকটাই কমপিটিটিভ হয়ে গিয়েছে। 

৪। আমাজন এফবিএ-র আরেকটি বড় অসুবিধা হল যেকোন ব্র্যান্ড বা ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে একসাথে বেশি প্রডাক্ট অর্ডার করতে হয়। একারণে নিজের পছন্দমতো পরিমাণের প্রোডাক্ট অর্ডার করার সুযোগ থাকে না। 

শেষ কথা:

আমাজন এফবিএ বর্তমান বিশ্বের বিজনেস মডেলগুলোর মধ্যে অনেক কার্যকরী একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ব্যবসা করে বেশিরভাগই সফল হয়ে থাকে। তবে পুরোপুরি সফল হতে হলে অবশ্যই সঠিক পরিকল্পনা এবং পুঁজি হাতে নিয়ে ব্যবসায় নামতে হবে। তাই আপনি যেই হন না কেন ব্যবসা শুরুর পূর্বে অবশ্যই যাচাই বাছাই করে নিয়ে তারপর শুরু করবেন।

FAQ:

১। আমাজন এফবিএ কি বিনামূল্যে শুরু করা যায়?

আমাজন এফবিএ ইনভেস্টমেন্ট ছাড়াও পার্টনারশিপ নিয়ে বিনামূল্যে শুরু করা যায়। এক্ষেত্রে একজন টাকা ইনভেস্ট করে আরেকজন ব্যবসার বাকি দিক সামলায় এবং প্রফিটের টাকা যোগ্য উপায়ে ভাগ করে নেয়। 

২। আমাজন এফবিএ কাদের জন্য লাভজনক?

যারা স্বল্প পুঁজি নিয়ে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করতে চান এবং অনেক কম সময়ে আয় ও লাভবান হতে চান তাদের জন্য আমাজন এফবিএ বিজনেস শুরু করা অনেক লাভজনক। এছাড়া কম সময়ে বিজনেস বড় করতেও এই মডেল অনেক বেশি কার্যকরী। 

৩। একজন বিগিনার হিসেবে আমাজন এফবিএ শুরু করা কতটুকু যৌক্তিক?

যেহেতু আমাজন এফবিএ একটি স্বল্প পুঁজির ব্যবসা তাই যারা বিগিনার রয়েছে তাদের জন্য এই বিজনেস মডেল অনেক আশানুরূপ ফলাফল দিতে পারবে। আবার এই মডেলে কম সময়েই আয় আসা শুরু হয় বলে ইনকামের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করারও দরকার হয় না। 


More Share, More Care!

Leave a Reply Cancel reply